বিশ্বের সেরা ১০ বিশ্ববিদ্যালয়

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান কোয়াক কোয়ারেল সাইমন্ডস (কিউএস) প্রতি বছর বিশ্ব সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করে। মোট ১১টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর র‍্যাংকিং প্রকাশ করে তারা। কিউএস এর র‍্যাংকিং আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত এবং সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। ২০২০ সালের নভেম্বরে ২০২১ সালের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর র‍্যাংকিং প্রকাশ করে। এতে বিশ্বের কোন বিশ্ববিদ্যালয় গুলো সেরা দশে রয়েছে সে গুলো সম্পর্কে চলুন জেনে আসি-

১. ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি(এমআইটি):

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যামব্রিজের একটি সেরা বেসরকারি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১০এপ্রিল, ১৮৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। যাকে পৃথিবীর সব থেকে মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ এমআইটি হল ইউরোপ সহ সারাবিশ্বের পলিটেকনিকের মডেল। যা বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও গবেষণাধর্মী লেখাপড়ার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়। এছাড়া ও যুক্ত আছে জীববিদ্যা, অর্থনীতি, ভাষাবিদ্যা, ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং চারুকলার বিষয় গুলো।

প্রতি বছর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোন না কোন গবেষক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। বিভিন্ন কাজের জন্য এমআইটির ছাত্র ও শিক্ষক সম্মিলিত ভাবে ৭৮টি নোবেল পুরস্কার এবং ৫০টি ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স পুরস্কার অর্জন করেন। প্রায় ১১হাজার শিক্ষার্থীদের জন্য লাইব্রেরিতে ২৯লাখ নিজস্ব বই আছে। এছাড়া ও আছে ৪৯ হাজার ছাপানো বই ইলেকট্রনিক জার্নাল কপি, ৬৭০টি রেফারেন্স ডাটাবেজ। এটিই পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যার রয়েছে নিজেদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট।

২. স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়:

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত। এটি একটি বেসরকারি গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৫ সালে। ৬৫০ একর বিশিষ্ট ক্যাম্পাসটি স্ট্যানফোর্ড অ্যাভিনিউ এবং স্যান্ডহিল রোড দ্বারা বেষ্টিত। একাডেমিক কেন্দ্রীয় ক্যাম্পাসটি পাওলো আল্টো এর কাছাকাছি অবস্থিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন উপাচার্য না থাকায় সব প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রেসিন্ডেটের হাতে নিহিত থাকে। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩হাজার শিক্ষার্থী গবেষণার জন্য হাজির হন স্ট্যানফোর্ডে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৯শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পায়। এখন পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৮৩জন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। গুগলের প্রতিষ্ঠাতা লারিপেজ ও সারগেইব্রিন, গলফ কিংবদন্তি টাইগার উডস, ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানি, আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিসহ আর ও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব পড়াশোনা করেছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

৩. হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়:

উচ্চ শিক্ষা মানের জন্য প্রসিদ্ধ এবং প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ড। ১৬৩৬ সালে ২৫০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি ২২ হাজার শিক্ষার্থীদের পদচারনায় মুখরিত। ২৩টি স্যাটেলাইট হাউসসহ ৯০টি আলাদা লাইব্রেরি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের অন্যতম পাথেয়। এছাড়াও বিখ্যাত ফগ মিউজিয়াম অফ আর্ট পরিচালনা করা হয় এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

জন হার্ভার্ড থেকে আজকের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। জন হার্ভার্ড তার সম্পদের প্রায় অর্ধেক (৭৭৯পাউন্ড) এবং তার তৈরি করা বিশাল বইয়ের সংগ্রহ তিনি দান করেন। ওনার নাম অনুসারে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম করণ করা হয়। ১৫৮জন নোবেল বিজয়ী, ১০টিঅস্কার, ৪৮টি পুলিৎজার সহ আরও অনেক পুরস্কার অর্জন করেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা শিক্ষার্থী। পৃথিবীর শতশত বিজ্ঞানী, দার্শনিক, শিল্পী এখান থেকে শিক্ষালাভ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন- মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ, ফেসবুকের জনক মার্ক জুকারবার্গ সহ অসংখ্য মানুষ।

৪. ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়:

ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলিতে অবস্থিত একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৬৮ সালের ২৩মার্চ এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১০টি ক্যাম্পাস নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ৯টি আন্ডার গ্রাজুয়েট ও গ্রাজুয়েট ক্যাম্পাস, আর একটি প্রফেশনাল। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে- যা শুধু বার্কলে নামেই পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি উদার দৃষ্টিভঙ্গির খ্যাতি রয়েছে এর। সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ নামে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একটি স্বতন্ত্র গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রথম বাংলাদেশ বিষয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র গবেষণা কেন্দ্র।

৫. অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়:

ইংরেজি ভাষাভাষী জগতের সবচেয়ে পুরাতন এবং প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় এটি। ১২শ শতাব্দীর প্রথমে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবীর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এটি দ্বিতীয় প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের কাছে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি এক স্বপ্নের নাম। পড়াশোনা, শিক্ষকতা, গবেষণা- সবকিছুর জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বিখ্যাত।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩৫০টি বিষয়ে এখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়। বিভিন্ন দেশের মিলিয়ে মোট ছাত্রছাত্রী সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। যাদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী। ব্রিটেনের ২৭ জন অভিজাত শাসকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতার এক বিরাট অংশ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। যুগান্তকারী অবদানের জন্য ৫০টি নোবেল পুরস্কারসহ ১২০টি অলিম্পিক মেডেল অর্জন করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

৬. সুইচ ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ইটিএইচ)জুরিখ:

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত একটি সরকারি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। যেটি ১৮৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বের বহু দেশ থেকে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় জ্ঞানার্জনের জন্য প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারনায় মুখরিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। পদার্থবিজ্ঞানের জনক আলবার্ট আইনস্টাইন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও চিকিৎসাবিদ্যায় এই পর্যন্ত মোট ২১ জন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।

৭. ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়যুক্তরাজ্য:

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে ১২০৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংরেজি ভাষাভাষী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দ্বিতীয় প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় এটি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ৩১টি কলেজ পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস নামে একটি নিজস্ব প্রকাশনী আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে প্রায় ১৫ মিলিয়ন বইয়ের বিশাল সুসজ্জিত লাইব্রেরি। এ যাবৎ এখানে ৯০ জন শিক্ষার্থী নোবেল পুরস্কারসহ আরও বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

৮. ইম্পেরিয়াল কলেজলন্ডন:

যুক্তরাজ্যের একটি বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইম্পেরিয়াল কলেজ। এটি প্রিন্স অ্যালবার্ট দ্বারা ইংল্যান্ডের লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কলেজটি মূলত বিজ্ঞান, প্রকৌশল,ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেন। বায়োমেডিকেল গবেষণার প্রধান কেন্দ্র ইম্পেরিয়াল কলেজে অবস্থিত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কাজের জন্য ১৪টি নোবেল পুরস্কার এবং ২টি ফিল্ডস পদক অর্জন করেছেন।

৯.শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র :

যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জন ডি রকফেলার এর মালিকানায় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো শহরে হাইড পার্ক এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকা জুড়ে এটি অবস্থিত। ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৮৯২ সালের ১ অক্টোবরে প্রথম ক্লাস দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ৮০টি নোবেল পুরস্কার এবং ৯টি ফিল্ডস পুরস্কারসহ আরও অনেক সম্মান অর্জন করেছেন।

১০. ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন:

লন্ডনে অবস্থিত একটি পাবলিক গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়। তালিকাভুক্তি অনুযায়ী এটি যুক্তরাজ্যের সব থেকে বড় স্নাতকোত্তর প্রতিষ্ঠান। জেরমি বেনথাম ১৮২৬ সালে একটি পাবলিক রিসার্চ বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ধর্মের শিক্ষানুরাগীরা ভর্তির সুযোগ পায়। এটিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে নারী শিক্ষার্থীদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন মূল ক্যাম্পাসে ১১টি বিভাগ রয়েছে। অ্যালেকজান্ডার গ্রাহাম্বেল, মাইকেল ডগলাসসহ বহু গুণীজনের পদচারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

Website | + posts

এই সম্পর্কিত আরো

সাম্প্রতিক